নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে তিন বছর বয়সী শিশু ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকের ভারে ভেঙে পড়েছেন বাবা রুবেল হোসেন ও মা জান্নাতুল নাইমা।
ছেলের মৃত্যুর শেষ মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা রুবেল। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেটার খুব কষ্ট হচ্ছিল। ভেতরে কী যন্ত্রণা চলছিল, তা বোঝাতে পারছিল না। হঠাৎ তার নানি দেখতে পান, তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। এ কথা শুনেই আমি আর তার মা আইসিইউতে ঢুকি। সেখানে যেতেই “বাবা”, “মা” বলে ডেকে ওঠে ইয়াসির। এরপর একটু হেসেই নিস্তেজ হয়ে যায়। ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে।’
রুবেল হোসেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের গামারিতলা এলাকার বাসিন্দা। তিনি একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ক্রেনচালক হিসেবে কাজ করেন। টিনের ছাউনির ছোট্ট বাড়িটিতে ছেলের মৃত্যুর পর নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। বাড়ির দুই পাশের খোলা নালায় জমে আছে পানি, যেখানে মশার লার্ভা দেখা গেছে। তবে এসব নালা থেকেই ইয়াসির ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
গত রোববার সকালে বাড়িতে বসে ছেলের অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনা তুলে ধরেন রুবেল। তিনি জানান, গত ২৯ সেপ্টেম্বর ইয়াসিরের জ্বর আসে। শুরুতে জ্বর ছিল ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইট। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়ার পর এক দিনের মধ্যে জ্বর কমে যায়। কিন্তু কয়েক দিন পর আবারও জ্বর দেখা দেয়। মঙ্গলবার তার তাপমাত্রা বেড়ে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছায়। চিকিৎসা চললেও জ্বর কমছিল না। ওই দিনই শিশুটির খিঁচুনি শুরু হয়।
রুবেলের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার হঠাৎ ইয়াসিরের শরীর ও হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। দ্রুত তাকে ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অনেক চেষ্টার পর তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।
রুবেল বলেন, শুক্রবার দুপুরে ইয়াসিরের রক্তবমি শুরু হয়। পায়খানার সঙ্গেও রক্ত যাচ্ছিল। এ সময় চিকিৎসকেরা তাকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি মাত্রায় অক্সিজেন দিতে শুরু করেন। পরদিন শনিবার সকালে তার মৃত্যু হয়।
ছয় মাস আগে রুবেল হোসেনের বাবা মারা যান। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই একমাত্র সন্তানকে হারাতে হলো তাকে। স্বজনেরা জানান, কথা বলতে শেখার পর থেকেই ইয়াসির বাড়ি মাতিয়ে রাখত। রাস্তায় চলাচলের সময় পরিচিত-অপরিচিত মানুষকে দেখলেই কথা বলতে চাইত। সেই শিশুর মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক।
মুঠোফোনে ছেলের ছবি দেখতে দেখতে কান্নায় ভেঙে পড়েন রুবেল। ছবিটি গত ঈদের সময় তোলা। ছবিতে পাঞ্জাবি পরা ইয়াসিরকে এক হাত ছড়িয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। ছেলের ছবির দিকে তাকিয়ে রুবেল বলেন, ‘ছেলেটার জন্য দোয়া কইরেন।’
এদিকে এলাকায় ডেঙ্গুর বিস্তার ও মশকনিধন কার্যক্রম নিয়ে কথা বলেছেন সোনাইছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শোভন ভৌমিক। ইউনিয়নের আটজন গ্রাম পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সপ্তাহের সাত দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মশকনিধন কার্যক্রম চালাচ্ছেন। ওষুধ ছিটিয়েও মশা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শোভন ভৌমিকের মতে, স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতনতা ছাড়া ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বৃষ্টির পানি জমে থাকলে তা সরিয়ে ফেলা এবং বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ইয়াসিরের মৃত্যুর ঘটনা ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি কার্যকর মশকনিধন কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি, খোলা নালা এবং মশার প্রজননস্থল নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি। একই সঙ্গে জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনি, রক্তপাত কিংবা হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃএস এম বদরুল আলম
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
Copyright © 2025 All rights reserved আজকের ঢাকা