বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলমকে ঘিরে প্রভাব বিস্তার ও পণ্য খালাসে অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পণ্যের ভুল তথ্য দিয়ে শুল্ক ফাঁকি এবং নিষিদ্ধ পণ্য খালাসের চেষ্টা করার অভিযোগ রয়েছে তার মালিকানাধীন এমএসটি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের বিরুদ্ধে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে পরিচালিত কয়েকটি পণ্য চালান পরীক্ষা করে ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পণ্যের বড় ধরনের অসংগতি পেয়েছে।
সিআইসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব চালানে আমদানি নিষিদ্ধ পাকিস্তানের গৌরী বিউটি ক্রিম, উচ্চ শুল্কের প্রসাধনী, গাড়ির দামি যন্ত্রাংশ এবং যৌন উত্তেজক ডিলে স্প্রের মতো পণ্য আনার অভিযোগ রয়েছে। এসব পণ্য আমদানির সময় এক ধরনের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে কনটেইনারে পাওয়া গেছে ভিন্ন পণ্য। এতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি আমদানি নীতিমালা লঙ্ঘনের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের কাফ করপোরেশন নামের একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান চীন থেকে সাড়ে ২২ টন টুথপিক আমদানির ঘোষণা দিয়ে পণ্য আনে। চালানটি খালাসের দায়িত্ব দেওয়া হয় এস এম সাইফুল আলমের মালিকানাধীন এমএসটি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে। এ চালানের বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-১০৯৮৭৬৬। অভিযোগ রয়েছে, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের যোগসাজশে প্রকৃত পণ্যের তথ্য গোপন করে কাস্টমস থেকে চালানটি ছাড় করানোর চেষ্টা করা হয়।
সিআইসি চালানটিতে সন্দেহজনক বিষয় দেখতে পেয়ে সেটি লক করে দেয়। তবে লক করার পরও তিন মাসের বেশি সময় ধরে কনটেইনারটির কায়িক পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা যায়, ঘোষণায় সাড়ে ২২ টন টুথপিক থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে পাওয়া গেছে মাত্র দেড় টন। বাকি জায়গায় ছিল বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী ও অন্যান্য পণ্য। এর মধ্যে পাকিস্তানের নিষিদ্ধ গৌরী বিউটি ক্রিম, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, হেয়ার রিমুভার স্প্রে, প্রিমিয়াম সানগ্লাস এবং ঘোষণার বাইরে থাকা যৌন উত্তেজক ডিলে স্প্রে পাওয়া যায়।
এ চালান ঘিরে কনটেইনারের নিরাপত্তা সিল পরিবর্তনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সিআইসি কনটেইনারটি লক করার পর মূল সিল কেটে সেখানে নতুন সিল লাগানো হয়। গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, কনটেইনারের লক পরিবর্তনের মাধ্যমে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে এস এম সাইফুল আলম বলেন, কাস্টমসের পরীক্ষার প্রয়োজনে কনটেইনার খোলা হয়েছিল। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়ে ও তাদের উপস্থিতিতে নতুন লক লাগানো হয়।
এই চালান আটকে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিআইসির তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রকিবকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এনবিআর কর্তৃপক্ষ এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, এমএসটি ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে যেসব আমদানিকারকের পণ্য খালাস হয়, সেসব চালানে অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ তৈরি হয়। এমনকি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে চালান লক করার পরও সময়মতো পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
শুধু কাফ করপোরেশনের চালান নয়, একই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে আরও কয়েকটি চালানে পণ্যের ভুল ঘোষণা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্র জানায়, এইচ আর এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিন রাবার বুশ আমদানির ঘোষণা দিয়ে প্রায় ১৩ টন বিভিন্ন ধরনের গাড়ির যন্ত্রাংশ খালাসের চেষ্টা করে। কিন্তু কনটেইনার পরীক্ষা করে ইঞ্জিন মাউন্টিং, সাসপেনশন বুশ, আর্ম বুশ, সেন্টার বিয়ারিং, স্প্রিং শ্যাকল ও স্টিয়ারিংয়ের মতো দামি মোটরযানের যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়। এসব পণ্যের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে কম শুল্কের পণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
একইভাবে নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স নামের আরেকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান চীন থেকে ২৩ টন হিট ট্রান্সফার পেপার আনার ঘোষণা দেয়। কিন্তু চালান পরীক্ষা করে প্রায় সাড়ে ২১ টন ফ্লেক্স ব্যানার পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, পণ্যের প্রকৃত বিবরণ আড়াল করে কাস্টমসের মাধ্যমে খালাস নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব ঘটনায় তদন্ত করে মিথ্যা ঘোষণার প্রমাণ পেয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, সাইফুল আলমের প্রভাবের কারণে তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত চালানে সহজে লক দেওয়া বা কঠোরভাবে কায়িক পরীক্ষা করার সাহস পান না অনেক কর্মকর্তা। তাদের দাবি, সিআইসি একটি চালান আটকে দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা আটকে ছিল। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে কাস্টমসের প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, তিনি কাস্টম হাউসের কমিশনারের কক্ষে গেলে তাকে বিশেষ প্রটোকল দেওয়া হয়। ফলে তার প্রতিষ্ঠানের পণ্য চালান পরীক্ষা করতে গিয়ে অধীনস্থ কর্মকর্তারা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। এ ছাড়া ছুটির দিনে কাস্টম হাউসে প্রবেশ করে প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা রাজস্ব কর্মকর্তার চেয়ারে বসে বিভিন্ন ফাইলে স্বাক্ষর করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনার ছবি ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এস এম সাইফুল আলম। কাফ করপোরেশনের চালানের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানটির মালিককে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চালানটির কাজ হওয়ার সময় তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। কনটেইনারের সিল বা লক পরিবর্তনের বিষয়ে তার বক্তব্য, পরীক্ষার প্রয়োজনে কনটেইনার খোলা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে কাস্টম হাউসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারেই নতুন লক লাগানো হয়। একই সঙ্গে বন্ধের দিনে কাস্টম কর্মকর্তার চেয়ারে বসে ফাইলে স্বাক্ষর করার অভিযোগও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
এদিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহা. মাহবুবুর রহমানের বক্তব্য জানার জন্য এক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পরে অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে তাকে খুদে বার্তাও পাঠানো হয়। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে একাধিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের পণ্য চালানে মিথ্যা ঘোষণা, নিষিদ্ধ পণ্য আমদানি, কনটেইনারের সিল পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে কারা জড়িত, কীভাবে চালানগুলো ছাড় করানোর চেষ্টা হয়েছে এবং সরকারি রাজস্বের কী পরিমাণ ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃএস এম বদরুল আলম
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
Copyright © 2025 All rights reserved আজকের ঢাকা