বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ রেলওয়ের একাধিক বড় উন্নয়ন প্রকল্পে দরপত্র মূল্যায়ন, প্রকল্পের ব্যয়, ঠিকাদার নির্বাচন, কেনাকাটা এবং সরকারি জমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যমুনা রেলসেতু, কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু এবং সিডিআরপিসহ বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম, অডিট আপত্তি উপেক্ষা, অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং রেলের জমি অবৈধভাবে দখলের মতো বিষয় সামনে এসেছে। এসব অভিযোগে রেলওয়ের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মো. সুবক্তগীনের নাম আলোচনায় এসেছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি উঠেছে।
যমুনা রেলসেতু প্রকল্পে সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের বিশেষ নিরীক্ষায় ৩৪টি আপত্তি তোলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব আপত্তির সঙ্গে প্রায় ৩ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকার অনিয়মের বিষয় যুক্ত রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্র মূল্যায়নের সময় কিছু প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা ও শর্ত পূরণের বিষয় নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও তাদের কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে দরপত্রের মূল শর্ত পরিবর্তন এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের আপত্তি উপেক্ষা করার অভিযোগও রয়েছে।
প্রকল্পটির দর নির্ধারণ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের হাতে লেখা একটি নোটের মাধ্যমে প্রাক্কলিত দর নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছিল। এ ছাড়া চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ না করে ঠিকাদারকে ১ হাজার ৭২৬ কোটি টাকার সুবিধা দেওয়া, বাজারদরের তুলনায় বেশি দামে মালামাল কিনে ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় এবং অনুমোদিত নকশা ছাড়াই ১২৭ কোটি টাকা খরচ দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণের জন্য ১১৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয়ের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
যমুনা রেলসেতু প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য জাপান থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা কিছু গাড়ির অবস্থান নিয়েও নিরীক্ষায় প্রশ্ন তোলার কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরেজমিনে এসব গাড়ির হদিস পাওয়া যায়নি। গাড়িগুলো কোথায় রয়েছে, কারা ব্যবহার করেছে এবং প্রকল্পের কাজে সেগুলোর ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। নিরীক্ষায় উত্থাপিত আপত্তি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রেও যোগ্যতা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের আন্তর্জাতিক টিম লিডার পদে নিয়োগের জন্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি থাকার শর্ত ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্যামবো-জেভির প্রস্তাবিত একজন প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কৃষি প্রকৌশলসংশ্লিষ্ট ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান একটি চিঠির মাধ্যমে ওই ডিগ্রিকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমমান হিসেবে বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে নিয়োগের শর্ত যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাগত সনদ ও মূল্যায়ন নথি যাচাই করে তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এই ঘটনায় মো. সুবক্তগীনের নামও এসেছে। তিনি রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্পটির বিভিন্ন কার্যক্রমে ভূমিকা রেখেছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ এবং কাজের মান নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অতীতেও অভিযোগ ওঠার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে তমা কনস্ট্রাকশনসহ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিল ছাড়ের সময় কমিশন নেওয়া, কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই বিল অনুমোদন এবং ঠিকাদারদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও ম্যাক্স ও তমা গ্রুপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অব্যাহত থাকার কথাও বলা হয়েছে।
রেলওয়ের আরেকটি প্রকল্পে ম্যাক্স গ্রুপের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামকে কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্রের ITB 37.4 শর্তে WD-1 ও WD-2 নামের দুটি প্রধান চুক্তির কাজ পেতে দরদাতাদের সম্মিলিত বার্ষিক টার্নওভার কমপক্ষে ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ম্যাক্সের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ২০৮ দশমিক ১৭ মিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, নির্ধারিত আর্থিক সক্ষমতার শর্ত পূরণে প্রায় ১১ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, অন্যান্য দরদাতার ক্ষেত্রে ছোটখাটো কাগজপত্র বা পরীক্ষার প্রতিবেদনে ঘাটতি থাকলেও তাদের প্রস্তাব বাতিল করার নজির রয়েছে। অথচ ম্যাক্সের আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে প্রায় ১ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের যুক্তি দেখিয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সম্মতি চাওয়ার জন্য একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরির অভিযোগও উঠেছে। তবে প্রকৃত সাশ্রয়ের হিসাব, দরপত্রের শর্ত শিথিল করার বৈধতা এবং এডিবির কাছে প্রস্তাব পাঠানো বা অনুমোদনের বিষয়টি নথির মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর্থিক সক্ষমতা যাচাই না করে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রকল্পের সময়সীমা, কাজের মান এবং সরকারি অর্থের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
প্রকল্পের বাইরেও রেলওয়ের সরকারি জমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রেলওয়ের ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়ালের ২০৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রেলের জমি রক্ষা এবং অবৈধ দখল প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দায়িত্ব রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু রাজধানীর খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় রেলের জমিতে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে খিলগাঁও এলাকায় রেলের জমিতে ৫৬০টিরও বেশি স্থায়ী বাণিজ্যিক দোকান গড়ে ওঠার দাবি করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, এসব স্থাপনা থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয় এবং এর সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশ থাকতে পারে।
সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল হয়ে থাকলে তা উদ্ধার, দখলদারদের পরিচয় শনাক্ত এবং জমি ব্যবহারের বিনিময়ে কোনো অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জমিগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছিল কি না, ইজারা থাকলে তা নিয়ম মেনে দেওয়া হয়েছে কি না এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের হিসাব ঠিক আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ রেলওয়ের জমি থেকে নিয়মিত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা এবং অবৈধ দখল বন্ধ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
এতগুলো অভিযোগের মধ্যেও আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান ও মো. সুবক্তগীনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) এবং মো. সুবক্তগীনকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) পদে পদায়ন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাঁদের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে রেলওয়ের বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে পদায়ন নিজে কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়; অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ তদন্ত এবং প্রমাণের আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানিয়েছেন, মেগা প্রকল্পগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক তথ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে এসেছে। বিস্তারিত তদন্তের পর দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও বর্তমান তদন্তের অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রেলওয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু অডিট আপত্তি উত্থাপন বা তদন্তের আশ্বাস দিলেই চলবে না। দরপত্র মূল্যায়ন, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ, কেনাকাটা, শুল্কমুক্ত গাড়ির ব্যবহার এবং সরকারি জমি দখলের অভিযোগগুলো আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা গেলে রেলওয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি বাড়বে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধ করা সহজ হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃএস এম বদরুল আলম
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
Copyright © 2025 All rights reserved আজকের ঢাকা