বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব কর্মকর্তা মোঃ ইরফান আলীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জ্ঞাত আয়ের বাইরে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কাস্টমসের বন্ড সুবিধাসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের ফাইল আটকে রেখে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায় করতেন তিনি। এভাবে অল্প সময়ের মধ্যে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলেও অভিযোগকারীর দাবি।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, কাস্টমস অ্যান্ড বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এ কর্মরত থাকার সময় ইরফান আলী বন্ড লাইসেন্স নবায়ন, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা, পণ্য ছাড় এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক অনুমোদনের ফাইল নিয়ে অনিয়ম করতেন। প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। টাকা দিতে রাজি না হলে নানা আইনি জটিলতা দেখিয়ে ফাইল আটকে রাখা এবং পণ্য খালাসে বিলম্ব ঘটানো হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে ‘সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড (ইউনিট-১ গার্মেন্টস)’ এবং ‘রুপা প্যাকেজিং অ্যান্ড এক্সেসরিজ লিমিটেড’ নামের দুটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের বন্ড সুবিধা ও কাস্টমসসংক্রান্ত কাজ করে দেওয়ার কথা বলে প্রায় দুই বছরের মধ্যে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ইরফান আলী। তাঁর চাহিদা অনুযায়ী অর্থ না দিলে সংশ্লিষ্ট ফাইলের কাজ এগোত না। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঁচামাল ছাড়, উৎপাদন এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতো বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
অভিযোগে ইরফান আলীর পারিবারিক পরিচয় ও সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তিনি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বেড়বাড়ী এলাকার বাসিন্দা মোঃ শমসের আলীর ছেলে। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা একজন কৃষক। সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান হয়েও সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে ইরফান আলী বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন। তাঁর নিজের পাশাপাশি স্ত্রী তুলি আক্তার এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নামেও জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ও আর্থিক বিনিয়োগ রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাগুরার ভায়নার মোড় এলাকায় স্ত্রী তুলি আক্তারের নামে প্রায় ৫২ শতক জমি কেনার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে দুদকের অভিযোগে। জমিটির ক্রয়মূল্য প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ ২০ হাজার টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। একই এলাকায় নির্মিত একটি ১০ তলা ভবনেও আত্মীয়দের সঙ্গে অংশীদারত্বে ইরফান আলীর অন্তত ২ কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
রাজধানীর উত্তরাতেও তাঁর সম্পদের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের একটি অভিজাত এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৬৬০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি। ফ্ল্যাটটির আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঝিনাইদহ সদর ও আশপাশের এলাকায় জমি কেনার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, শওকত ও মনির নামের দুই ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় ৬৬ লাখ টাকায় ৩ বিঘা জমি কেনেন ইরফান আলী। পাশাপাশি ৮১ নম্বর ও ১১০ নম্বর বিষয়খালি মৌজায় নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে আরও অন্তত ১০ বিঘা জমি রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব জমি কেনার অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী।
শুধু শহর কিংবা জমিজমা নয়, গ্রামের বাড়িতেও বিলাসী জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে অভিযোগে। সেখানে একটি একতলা বাড়ি রয়েছে, যার প্রতিটি কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি ব্যবহার করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, একজন সরকারি রাজস্ব কর্মকর্তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে তাঁর পরিবারের জীবনযাপন, বাড়িঘর ও সম্পদের পরিমাণের কোনো সামঞ্জস্য নেই।
দুদকে জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ইরফান আলী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রায় ১০০ ভরি স্বর্ণালংকার রয়েছে। এ ছাড়া ৮০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং বিভিন্ন ব্যাংকে কয়েক কোটি টাকার এফডিআর ও ডিপিএস থাকার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। এসব সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং এর অর্থের উৎস কী, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
ইরফান আলীর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেও তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, তাঁর বাবা মোঃ শমসের আলী একজন কৃষক। একসময় পরিবারটি আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। ছেলের চাকরি হওয়ার পর পরিবারের অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে পরিবারের সম্পদ ও জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, বর্তমানে পরিবারটি এলাকার অন্যতম সচ্ছল পরিবারে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের আরও দাবি, রাজধানী ঢাকা এবং মাগুরায় শ্বশুরবাড়ির এলাকায় ইরফান আলীর বিপুল সম্পদ রয়েছে। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থার যে পরিবর্তন হয়েছে, তা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে।
এদিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোঃ ইরফান আলীর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর নম্বরে খুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। কোনো অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে মোঃ ইরফান আলীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের যেসব অভিযোগ দুদকে জমা পড়েছে, সেগুলোর সত্যতা এখনো তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সম্পদের উৎস যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃএস এম বদরুল আলম
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
Copyright © 2025 All rights reserved আজকের ঢাকা