মানহীন ওষুধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কোথায়? ঔষধ প্রশাসনের আলমগীর হোসেনকে ঘিরে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার ভূমিকা নিয়েই এবার প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি পরীক্ষাগারে মানহীন হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পরও মেসার্স বায়োজেন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের দুটি ওষুধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বরং সংশ্লিষ্ট ওষুধের উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধের নির্দেশ এবং মামলা করার উদ্যোগ নেওয়ার পরও বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও লাইসেন্সিং অথরিটি মোহা. আলমগীর হোসেনের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ঘটনার শুরু চলতি বছরের এপ্রিল মাসে। জাতীয় ঔষধ নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার (NDCL), মহাখালী, ঢাকায় বায়োজেন ফার্মাসিউটিক্যালসের উৎপাদিত দুটি ওষুধের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ওষুধ দুটি হলো Maxcoral-DX Tablet এবং Maxcoral-D Tablet। গত ৬ এপ্রিল প্রকাশিত পরীক্ষার প্রতিবেদনে উভয় ওষুধের নির্দিষ্ট ব্যাচে ভিটামিন-ডি৩-এর পরিমাণ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে অনেক কম পাওয়া যায়। পরীক্ষার ফলাফলে ওষুধ দুটিকে নির্ধারিত মান অনুযায়ী নয় বলে উল্লেখ করা হয়।

পরীক্ষাগারের তথ্য অনুযায়ী, Maxcoral-DX Tablet-এর ব্যাচ নম্বর 5K17274-এ প্রতি ট্যাবলেটে ৪০০ IU ভিটামিন-ডি৩ থাকার কথা থাকলেও পরীক্ষায় পাওয়া যায় ২৭৩.৮১ IU। অর্থাৎ ঘোষিত মাত্রার তুলনায় প্রায় ৩১.৫ শতাংশ কম উপাদান পাওয়া গেছে। অন্যদিকে Maxcoral-D Tablet-এর ব্যাচ নম্বর 5K12276-এ ২০০ IU থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে মাত্র ১৩৫.৫২ IU। এ ক্ষেত্রেও ভিটামিন-ডি৩-এর পরিমাণ প্রায় ৩২.২ শতাংশ কম। পরীক্ষাগারের ড্রাগ অ্যানালিস্ট তাঁর প্রতিবেদনে নমুনা দুটি নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন পূরণ করেনি বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন।

সরকারি পরীক্ষায় এমন ঘাটতি ধরা পড়ার পর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ওষুধ দুটির নিবন্ধন সাময়িকভাবে স্থগিত করে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট মানহীন ওষুধের বিষয়ে ঔষধ আদালতে মামলা করার উদ্যোগ নিতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব নির্দেশনার পরও পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ কার্যকরভাবে এগোয়নি। যে ঘটনায় মামলা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল, সেটি কী কারণে আটকে গেল, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও লাইসেন্সিং অথরিটি মোহা. আলমগীর হোসেনের দায়িত্ব পালনকালে বিষয়টির কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। আদালতে মামলা করার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কেন মামলা করা হয়নি, কারা এর দায়িত্বে ছিলেন এবং কোন পর্যায়ে ফাইল আটকে ছিল, তার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, নিবন্ধন স্থগিতের পরও বায়োজেন ফার্মাসিউটিক্যালসের সংশ্লিষ্ট ওষুধ বাজারে সরবরাহ ও বিক্রি অব্যাহত ছিল। যদি এ অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে তা শুধু ওষুধ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম লঙ্ঘন নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি।

এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। সরকারি পরীক্ষাগারে ওষুধের মান নিয়ে অনিয়ম ধরা পড়ার পরও কেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধের নির্দেশ কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে? বাজারে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাচের ওষুধ জব্দ করা হয়েছে কি না? ঔষধ আদালতে মামলা করার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও মামলা না হওয়ার কারণ কী? এসব বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

এছাড়া অনেক অভিযোগকারীরা মনে করছেন ডিজি মোহা. আলমগীর হোসেন এবং বায়োজেন ফার্মাসিউটিক্যালসের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো ধরনের অনৈতিক আর্থিক লেনদেন বা যোগসাজশ ছিল, এজন্য দিনের পর দিন ডিজি এসব বিষয় দেখেও না দেখার ভান ধরে ছিলেন। অভিযোগকারীরা মনে করছেন, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গড়িমসি, সম্ভাব্য ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কোনো আর্থিক অনিয়ম হয়ে থাকলে তা বেরিয়ে আসতে পারে।

এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগও জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। আবেদনে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ, মামলা দায়ের না হওয়ার কারণ অনুসন্ধান, সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেন ও ব্যাংক হিসাব যাচাই এবং দায়িত্বে অবহেলা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধের মান নিয়ে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ নির্ধারিত উপাদানের ঘাটতি থাকলে রোগীরা প্রত্যাশিত চিকিৎসাগত উপকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে কোনো ওষুধ সেবনকারী রোগীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই শুধু উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা যায় না; বাজার থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাচের ওষুধ প্রত্যাহার, সরবরাহ বন্ধ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহা. আলমগীর হোসেনের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে সরকারি পরীক্ষাগারে মানহীন হিসেবে শনাক্ত হওয়া ওষুধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্বের কারণ এবং বাজারজাত বন্ধের নির্দেশ কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। জনস্বার্থে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *