প্রাক্কলনের চেয়ে বেশি দামে কার্যাদেশ, মাদারীপুর এলজিইডির প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ মাদারীপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র ও কার্যাদেশ নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন এলজিইডির সাবেক মাদারীপুর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বর্তমানে একটি সরকারি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বাবুল আখতার। তাঁর দায়িত্ব পালনকালে দরপত্রে কারসাজি, অনুমোদনহীন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ, কাজ না করেই কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলন এবং প্রাক্কলিত দরের চেয়ে বেশি মূল্যে কার্যাদেশ দেওয়ার মতো অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, করোনাকালীন সময়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে একাধিক কাজে অনিয়মের মাধ্যমে সরকারের বিপুল অর্থের ক্ষতি করা হয়েছে। এ ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ, প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ খরচ দেখানো এবং নতুন প্রকল্পের সংশোধিত বরাদ্দের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরে তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিবচর উপজেলায় সড়ক উন্নয়নকাজের কয়েকটি দরপত্রে প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দরপত্র আইডি ৫৮৯৬৪৫-এর আওতায় আড়িয়াল খাঁ ব্রিজ থেকে বাবলাতলা বাজার এবং শিবচর সদর থেকে রাজৈর হয়ে উত্রাইল জিসি সড়ক উন্নয়নকাজে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, কাজটির কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২৬ কোটি ৬০ লাখ টাকায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হামীম ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া এই কার্যাদেশে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অতিরিক্ত এই অর্থ প্রাক্কলনের তুলনায় প্রায় ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি।
একই দরপত্রের আরেকটি প্যাকেজেও অতিরিক্ত দামে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ওই কাজের প্রাক্কলিত মূল্য ছিল ২২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। কিন্তু এর চেয়ে প্রায় ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এতে সরকারের প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি কাজের ক্ষেত্রে দরপত্রে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ব্যয় কমানোর কথা থাকলেও এসব প্রকল্পে বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু সড়ক নির্মাণ নয়, সেতু নির্মাণ প্রকল্পেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনূর্ধ্ব ১০০ মিটার সেতু নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র আইডি ৫৬০৫০৫-এর আওতায় প্রায় ১৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকার একটি কাজে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ কাজেও মেসার্স হামীম ইন্টারন্যাশনালের নাম এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এর ফলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। তবে এসব অর্থের হিসাব ও কার্যাদেশের বৈধতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের নথি, মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং চুক্তিপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
মাদারীপুর সদর উপজেলায়ও প্রকল্পের প্রাক্কলন তৈরির ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আরসিআইপি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকার একটি কাজে ভুয়া বা ত্রুটিপূর্ণ প্রাক্কলন তৈরি করে অনুমোদন নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। ওই কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে মেসার্স কহিনুর এন্টারপ্রাইজের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাক্কলন তৈরির সময় প্রকৃত ব্যয়, কাজের পরিমাণ এবং নির্মাণসামগ্রীর দর যথাযথভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া ছোট ও মাঝারি আকারের আরও কয়েকটি প্রকল্পে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। দরপত্র আইডি ২৬২৯৭৫-এর প্যাকেজ ২২৮-এ মেসার্স পাভেল এন্টারপ্রাইজকে ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি দামে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দরপত্র আইডি ৩৩৮৩২৯-এর প্যাকেজ ৩০৮-এ হাবিবা কনস্ট্রাকশনকে ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একইভাবে দরপত্র আইডি ৩১৬০৬৯-এর প্যাকেজ ২৭৮-এ মেসার্স মোহাম্মদ ফারুক মিয়া এবং দরপত্র আইডি ২৬২৯৭৬-এর প্যাকেজ ২১৪-এ মেসার্স হামীম ইন্টারন্যাশনালকে ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ বেশি দামে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় আরও রয়েছে দরপত্র আইডি ৩৩৮৩৩০-এর প্যাকেজ ৩০৯, যেখানে মেসার্স আতাহার এন্টারপ্রাইজকে ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে দরপত্র আইডি ৩৩৩২০০-এর প্যাকেজ ২৮০-এ মেসার্স মাদবর ট্রেডার্সকে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি দামে কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করতে প্রতিটি কাজের অনুমোদিত প্রাক্কলন, দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাব এবং চূড়ান্ত কার্যাদেশের মূল্য তুলনা করা জরুরি।
এইচবিবি সড়ক ও ড্রেনেজ নির্মাণের কয়েকটি কাজেও প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একাধিক প্রকল্পে একই ধরনের ঘটনা ঘটায় দরপত্র মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবে শুধু প্রাক্কলিত দরের চেয়ে বেশি মূল্যে কার্যাদেশ দেওয়া হলেই অনিয়ম প্রমাণিত হয় না; দরপত্রের শর্ত, প্রতিযোগিতার ধরন, অনুমোদিত মূল্যসীমা এবং প্রযোজ্য সরকারি ক্রয়বিধি অনুসারে বিষয়টি যাচাই করতে হবে।
বাবুল আখতার মাদারীপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ঘনিষ্ঠ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার জন্য দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বারবার কার্যাদেশ দেওয়া এবং একাধিক প্রকল্পে বেশি দামে কাজ অনুমোদনের ঘটনা খতিয়ে দেখা হলে সম্ভাব্য যোগসাজশের বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
২০২০-২০২১ অর্থবছরে করোনাকালীন লকডাউনের সময় মাদারীপুর এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়নকাজে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং প্রকল্পগুলো বাস্তবে কতটা সম্পন্ন হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ে কিছু কাজের বাস্তব অগ্রগতি ও নথিতে দেখানো অগ্রগতির মধ্যে অসংগতি থাকতে পারে। প্রকল্পের পরিমাপ বই, কাজ সম্পন্ন হওয়ার সনদ, বিল-ভাউচার, ঠিকাদারকে দেওয়া অর্থ এবং সরেজমিনে কাজের অবস্থা মিলিয়ে দেখা হলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত বাবুল আখতারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তিনি ফোনকলটি রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য এ প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সংশ্লিষ্ট সময়ের সব দরপত্র, প্রাক্কলন, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, বিল পরিশোধের হিসাব এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের নথি স্বাধীনভাবে নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কাজ পেয়েছে এবং দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা দরকার।
অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও নথিভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশের অপেক্ষা।
