বসুন্ধরা থেকে পূর্বাচল—গণপূর্তের প্রকৌশলীর নামে-বেনামে সম্পদের অভিযোগ, যাচাইয়ের প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ ইসকান্দার আলীর বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন, প্রকল্পের কাজে অনিয়ম, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ছাড় এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে ঢাকার বসুন্ধরা, গুলিস্তান, বকশিবাজার, পূর্বাচল এবং মাগুরায় বিপুল সম্পত্তির বিবরণ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা, মূল্য, অর্থের উৎস কিংবা সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র ও তদন্তের ফলাফল স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ ইসকান্দার আলীকে ঘিরে দুর্নীতি, সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রকল্পের বিল-ভাউচার, কাজের পরিমাপ এবং ঠিকাদারি কার্যক্রমে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাঁর নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট আর্থিক নথি, সম্পত্তির দলিল, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য কিংবা কোনো তদন্ত প্রতিবেদনের কপি সরবরাহ করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
প্রকল্পের বিল ও ঠিকাদারি কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন
প্রাপ্ত অভিযোগে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল প্রকল্পে কাজের বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে বিল প্রস্তুত ও অর্থ ছাড়ের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে লিফট স্থাপন, জেনারেটর সরবরাহ, কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সরকারি ভবনের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার মতো কাজগুলোতে অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে সরেজমিনে কাজ সম্পন্ন না করেই কাগজপত্র প্রস্তুতের মাধ্যমে বিল ছাড়ের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, ভ্যারিয়েশন, ফ্রন্টলোডিং এবং কাজের পরিমাপসংক্রান্ত নথি ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
তবে কোন প্রকল্পে কত টাকা অনিয়ম হয়েছে, কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত এবং কোন বিল বা ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ ছাড় হয়েছে—এসব বিষয়ে অভিযোগের সঙ্গে নির্দিষ্ট প্রকল্প নম্বর, কার্যাদেশ, বিলের কপি কিংবা অডিট আপত্তি পাওয়া যায়নি। তাই এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রকল্পভিত্তিক নথি পরীক্ষা প্রয়োজন।
সম্পদের তালিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ
অভিযোগে সৈয়দ ইসকান্দার আলীর নামে ও বেনামে বিপুল সম্পদ থাকার দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
-
ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি বাড়ি বা সম্পত্তি।
-
মাগুরা জেলার ৭ নম্বর পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নে প্রায় ১০০ বিঘা জমি থাকার দাবি।
-
গুলিস্তানের হলমার্কেট এলাকায় ২৭টি দোকানের মালিকানা থাকার অভিযোগ।
-
বকশিবাজার এলাকায় চারটি দোকানের মালিকানার দাবি।
-
পূর্বাচলে প্রবাসী পল্লী গ্রুপে ৩০ কাঠা জমি থাকার অভিযোগ।
অভিযোগে এসব সম্পদের মোট মূল্য শতকোটি টাকার বেশি বলে দাবি করা হয়েছে। তবে সম্পত্তিগুলোর দলিল, খতিয়ান, নামজারি, হোল্ডিং নম্বর, ক্রয়মূল্য কিংবা প্রকৃত মালিকানা সম্পর্কে কোনো যাচাইযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি।
বিশেষ করে কোনো সম্পত্তি সরাসরি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নামে, পরিবারের সদস্যদের নামে, নাকি অন্য কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত—তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সম্পদ অর্জনের সময়কাল, আয়কর বিবরণী এবং বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
পদায়ন ও বদলি ঘিরেও প্রশ্ন
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন এবং বদলির ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন ওই কর্মকর্তা। ঢাকা গণপূর্তের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে তাঁর পদায়ন ও দায়িত্ব পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
প্রকাশিত সংবাদসূত্রে দেখা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে সৈয়দ ইসকান্দার আলীকে গণপূর্ত ই/এম পিএন্ডডি বিভাগ, ময়মনসিংহ থেকে গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৬, ঢাকায় পদায়নের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। তবে বদলিটি অনিয়মের মাধ্যমে হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
লিফট ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রকাশিত সংবাদ
এদিকে ২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর দৈনিক কালবেলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মিরপুরের পাইকপাড়া সরকারি আবাসিক প্রকল্পের লিফটের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, লিফটের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের বিষয়ে রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আগেই সতর্ক করেছিল। পরবর্তী সময়ে একটি লিফট দুর্ঘটনায় তিনজন আহত হন।
ওই প্রতিবেদনে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে সৈয়দ ইসকান্দার আলীর বক্তব্যও প্রকাশিত হয়। তিনি জানান, লিফটগুলোতে শুরু থেকেই সমস্যা ছিল এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যন্ত্রাংশের জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ অর্থ দাবি করায় যাচাই-বাছাই করতে সময় লেগেছে। এ ঘটনায় মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল বলে কালবেলার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে লিফট ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওই প্রতিবেদন এবং বর্তমানে উত্থাপিত ঘুষ, ভুয়া বিল ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগ পৃথক বিষয়। একটি ঘটনার তথ্য দিয়ে অন্য অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
অভিযোগের পাশাপাশি পাল্টা বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ
সৈয়দ ইসকান্দার আলীকে ঘিরে প্রকাশিত অভিযোগ ও তাঁর পদায়ন নিয়ে ভিন্নমতও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ২০২৬ সালের ৯ আগস্ট সংবাদ পরিক্রমায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়, তাঁকে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপনের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁদের দাবি, ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালনকালে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে বঞ্চিত ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁকে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ ই/এম-৬ বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন কর্মকর্তাকে ঘিরে অভিযোগ সামনে আসছে। তবে এসব পাল্টা বক্তব্যও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে; স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা হয়নি।
সব মিলিয়ে সৈয়দ ইসকান্দার আলীকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ ও নথিনির্ভর অনুসন্ধান প্রয়োজন। সরকারি প্রকল্পের কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, কাজের পরিমাপ, অডিট প্রতিবেদন, সম্পত্তির দলিল এবং আয়কর নথি যাচাইয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া জরুরি।
অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান পরিষ্কার করা—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
