মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে যেভাবে বিদেশে অর্থ পাঠান ইরানিরা

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ইরান। দেশটির ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিদেশে অর্থ পাঠানো এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন সম্পন্ন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ফলে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প বিভিন্ন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে ইরানিদের।

বিকল্প এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশে পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধ করা সম্ভব হলেও প্রতিটি পদ্ধতির সঙ্গে রয়েছে বাড়তি খরচ, প্রতারণার ঝুঁকি এবং লেনদেনের অনিশ্চয়তা। নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও দ্রুততার দিক থেকে এগুলো প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সমতুল্য নয়।

মুদ্রা বিনিময়কারীদের নেটওয়ার্ক
বিদেশে অর্থ পাঠানোর অন্যতম বিকল্প হলো বিভিন্ন দেশের মুদ্রা বিনিময়কারীদের নেটওয়ার্ক। এই অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় ইরানে স্থানীয় মুদ্রার প্রয়োজন রয়েছে এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে বিদেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন রয়েছে এমন ব্যক্তিদের চাহিদার সমন্বয় করা হয়। এর ফলে ইরান ও বিদেশের ব্যাংক হিসাবের মধ্যে সরাসরি অর্থ স্থানান্তর না করেও লেনদেন নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়।

এছাড়া মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেও বিদেশে অর্থ পাঠান অনেকে। সাধারণত গ্রাহক ইরানে স্থানীয় মুদ্রায় মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানকে অর্থ দেন। এরপর প্রতিষ্ঠানটি অথবা বিদেশে তাদের অংশীদার নিজস্ব বিদেশি তহবিল ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীকে গ্রহণযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রায় মূল্য পরিশোধ করে।

এ ধরনের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ে প্রবেশাধিকারের ঘাটতি কিছুটা পূরণ করলেও এতে বাড়তি ফি, বিনিময় হারের কারণে আর্থিক ক্ষতি, বিলম্ব এবং জটিলতা তৈরি হয়।

ব্যক্তিগত সমঝোতায় অর্থ স্থানান্তর
কিছু ইরানি কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তা না নিয়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সমঝোতার মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাঠান। এক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তির পাশাপাশি অপরিচিত মানুষের সঙ্গেও লেনদেন করতে হয়। আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা অকার্যকর হলে এসব উদ্যোগ সাময়িক সমাধান দিতে পারে। তবে পুরো ব্যবস্থাটি মূলত পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল।

জার্মানিতে বসবাসরত ইরানি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপক রেজা নিজের পুরো নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ ধরনের লেনদেনে অপরিচিত ব্যক্তিদের কোনও আইনি নথি বা প্রমাণ ছাড়াই পরস্পরের ওপর আস্থা রাখতে হয়। যেকোনও পক্ষ যেকোনও সময় চুক্তি থেকে সরে দাঁড়াতে পারে। এতে অন্য পক্ষ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

ইরানি বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ আশকান বাহরামির ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালিয়ে নিতে তাদের অনানুষ্ঠানিক মুদ্রা বিনিময় ও অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে অর্থ হারানো, প্রতারণা এবং উচ্চ লেনদেন ব্যয়ের মতো ঝুঁকি রয়েছে।

ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনও এসব নেটওয়ার্ককে বিপর্যস্ত করতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত কিছু আর্থিক নেটওয়ার্ক যুদ্ধের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এসব ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হচ্ছে।

ক্রিপ্টোকারেন্সিও পুরোপুরি নিরাপদ নয়
প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা এড়িয়ে সম্পদ স্থানান্তরের আরেকটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। তবে ডিজিটাল মুদ্রাও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে পুরোপুরি সুরক্ষা দিতে পারছে না।

চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দফতর (ওএফএসি) ইরানের কয়েকটি বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে নোবিটেক্স, ওয়ালেক্স, বিটপিন ও রামজিনেক্স।

ইরানের ফিনটেক অ্যাসোসিয়েশনের বোর্ড চেয়ারম্যান আলিরেজা ইয়াগুবি সতর্ক করে বলেন, ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন শনাক্ত করা সম্ভব। ব্যক্তি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল ওয়ালেটের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো গুরুতর পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কার পাশাপাশি ইন্টারনেট সংযোগে মাঝেমধ্যে বিঘ্ন ঘটায় অর্থ স্থানান্তরের এই পদ্ধতিও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

পণ্য আমদানিতে বাড়ছে বিলম্ব
বিদেশ থেকে পণ্য আমদানিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট শুধু অর্থ পরিশোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধজনিত বিঘ্ন এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের পর পরিবহনব্যবস্থা ও সরবরাহপথে জটিলতা বেড়েছে। এতে পণ্য পৌঁছাতে বেশি সময় লাগছে এবং চালান কখন হাতে আসবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

চীনের সাংহাই বন্দর ব্যবহার করে ইরানে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কতটা কঠিন হয়ে উঠেছে, তা তুলে ধরেছেন অ্যারন ট্রেডিং গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরগাভান গাজানফারি। ইরানে পণ্য পাঠানোর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোর একটি এই বন্দর।

গাজানফারি বলেন, আগে পণ্য পরিবহনে ২৬ দিন লাগত। কিন্তু এখন সেই সময় বেড়ে ১০২ থেকে ১২০ দিন পর্যন্ত হচ্ছে। ফলে গ্রাহকেরা আমদানির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছেন। তার মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ইরানের সরবরাহপথগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে।

রিয়ালের দরপতনে কমছে ক্রয়ক্ষমতা
বিদেশে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারলেও ইরানিদের সামনে আরেকটি বড় বাধা রয়েছে- পণ্য কেনার সামর্থ্য। দেশটির মুদ্রা রিয়ালের ধারাবাহিক দরপতনে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

মার্কিন ডলারের বিপরীতে গত এক মাসে ইরানি রিয়ালের মূল্য ১০ শতাংশের বেশি, গত এক বছরে ৫৫ শতাংশের বেশি এবং গত পাঁচ বছরে প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে।

এ পরিস্থিতিতে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির ব্যয় বাড়ছে। অর্থ স্থানান্তরের বাড়তি খরচ ও পরিবহন বিলম্বের সঙ্গে মুদ্রার অবমূল্যায়ন যুক্ত হয়ে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ আরও বাড়াচ্ছে।

ইরানের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে দেশটির মানুষের সামনে এখন শুধু বিদেশে অর্থ পাঠানোর বিকল্প খুঁজে বের করার চ্যালেঞ্জই নেই। ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধের মধ্যে কত দিন তারা এসব অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারবেন, আর এর জন্য কতটা আর্থিক মূল্য দিতে হবে- সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *