মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির হিড়িক, চট্টগ্রাম বন্দরে তিন মাসে ৪৬৭ চালান আটক

বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণার প্রবণতা বাড়ছে। শুল্ক ফাঁকি দিতে আমদানিকারকদের একটি অংশ পণ্যের প্রকৃত পরিচয়, পরিমাণ ও মূল্য গোপন করে পণ্য খালাসের চেষ্টা করছে। তবে এসব অনিয়ম ঠেকাতে তৎপরতা বাড়িয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সন্দেহজনক ৪৬৭টি আমদানি চালান আটক করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২৭০টি মামলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চালান থেকে রাজস্ব ও জরিমানা হিসেবে মোট ৫৮ কোটি ২ লাখ টাকা আদায় করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এবার সন্দেহজনক চালান আটকের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ৩৬১টি চালান আটক করা হয়েছিল। তখন এসব ঘটনায় ১৯৯টি মামলা হয় এবং রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আদায় হয়েছিল ৩১ কোটি ৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চালান আটকের পাশাপাশি মামলার সংখ্যা ও আর্থিক আদায়ও বেড়েছে।
এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ১৬৭টি আমদানি চালান আটক করেছিল কাস্টমস। ওই সময়ে ২২৮টি মামলা করা হয় এবং রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আদায় হয়েছিল ২৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ১৬৮টি চালান আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৯টি চালান শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করে ৮৪টিতে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম পাওয়া যায়। বাকি ৫৫টি চালানে কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার জন্য আমদানিকারকদের কেউ কেউ পণ্যের ঘোষণা পরিবর্তন করে কিংবা প্রকৃত তথ্য আড়াল করে পণ্য আনার চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পণ্যের ভুল ট্যারিফ বা এইচএস কোড ব্যবহার, পণ্যের প্রকৃত মূল্য কম দেখানো এবং চালানে থাকা পণ্যের পরিমাণ গোপন করার ঘটনা। আবার কম শুল্কের পণ্যের ঘোষণা দিয়ে বেশি শুল্কযোগ্য পণ্য আমদানি করা হয়। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে মিথ্যা ঘোষণার বেশ কয়েকটি ভিন্নধর্মী কৌশলও শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে স্ক্র্যাপ বা ভাঙারি পণ্যের ঘোষণা দিয়ে নতুন যন্ত্রপাতি ও বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে মডেলিং ক্লে বা খেলনা তৈরির উপকরণ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে প্রসাধনী আনার ঘটনাও ধরা পড়েছে। আবার অন্য পণ্যের চালানের মধ্যে লুকিয়ে মোবাইল ফোন আনা এবং কাপড়ের প্রকৃত ধরন ও বিবরণ গোপন করে ভুল ঘোষণা দেওয়ার ঘটনাও শনাক্ত করেছে কাস্টমস।
বিশেষ করে স্ক্র্যাপ ঘোষণার আড়ালে নতুন যন্ত্রপাতি বা দামি গাড়ি আনার মাধ্যমে শুল্কের পরিমাণ কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে প্রসাধনী ও মোবাইল ফোনের মতো পণ্য গোপনে আনা হলে প্রকৃত পণ্যের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক-কর আদায় বাধাগ্রস্ত হয়। কাপড় আমদানির ক্ষেত্রেও পণ্যের ধরন, মান ও বিবরণে ভুল তথ্য দিয়ে শুল্ক কম দেওয়ার সুযোগ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র মোহাম্মদ শরীফ আল আমিন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির প্রবণতা বেড়েছে। এ ধরনের চালান শনাক্ত করতে কাস্টমসের নজরদারি ও তদারকি কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে পণ্যের তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেও কাজ করা হচ্ছে।
কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পুরো সময়ে এআইআর শাখা মোট ১ হাজার ৪৫১টি আমদানি চালান আটক করে। এসবের মধ্যে ৮৪৩টি চালানে অনিয়ম পাওয়ায় মামলা করা হয়। ওই অর্থবছরে অনিয়মের ঘটনায় ৫২ কোটি ৮ লাখ টাকা রাজস্ব এবং ৫৯ কোটি ৬৩ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। সব মিলিয়ে আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক ও চট্টগ্রাম কাস্টম অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মো. ইসমাইল খান বলেন, মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে পণ্য আমদানির পেছনে অনেক সময় সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করে। এসব চক্রের কারণে বৈধ ব্যবসায়ীরাও প্রতিযোগিতায় সমস্যার মুখে পড়েন। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা করা আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তবে একই সঙ্গে বৈধ আমদানি ও ব্যবসা-বাণিজ্য যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকেও নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি ঠেকাতে শুধু এআইআর শাখা নয়, শুল্ক গোয়েন্দা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা ইউনিটও কাজ করছে। চালানের কাগজপত্র যাচাই, সন্দেহজনক পণ্যের কায়িক পরীক্ষা এবং তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ আমদানি শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে আমদানির নামে শুল্ক ফাঁকির নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করায় এসব অনিয়ম বন্ধ করতে নজরদারি আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
