সংসদে শব্দযন্ত্রের ত্রুটি ঘিরে ‘সাবোটাজ’ সন্দেহ, তদন্তের চার দিনের মাথায় বদলি গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সাউন্ড সিস্টেম বিভ্রাট ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম-৭) মো. আনোয়ার হোসেনকে বদলি করা হয়েছে। অপরদিকে জাতীয় সংসদে নতুন সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনের সুপারিশ সংসদ কমিটি। কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংসদ অধিবেশন কক্ষে শব্দ তৈরি হওয়ার এক সেকেন্ড বা তার কম সময়ের মধ্যে শোষণ করতে সক্ষম ও প্রতিধ্বনিবিহীন সাউন্ড সিস্টেম স্থাপন করতে হবে। এ বিষয়ে দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সংসদ কমিটির বৈঠকে ওই সুপারিশ করা হয়। কমিটির সভাপতি ও চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলামের সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন কমিটির সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, মো. শহিদুল ইসলাম, নায়াব ইউসুফ আহমেদ, এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, অলি উল্লাহ, সাইফুল আলম মিলন ও আবুল হাসনাত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয় থেকে জানানো হয়, বৈঠকে সাউ- সিস্টেম ছাড়াও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অবস্থিত সংসদ সদস্য ভবন ও নাখালপাড়ায় অবস্থিত সংসদ সদস্য ভবনসমূহ বরাদ্দের নিমিত্ত সংস্কার ও মেরামত কাজের অগ্রগতি, সুপেয় পানি সংকট, সংসদ সদস্যদের জরুরি প্রয়োজনে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত ও এমপি হোষ্টেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলোচনা শেষে ইন্টারনেটের ধীরগতি দূর করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে সংসদ এলাকায় পর্যাপ্ত সুপেয় পানি সরবরাহ ও আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে বাসা প্রস্তুতপূর্বক সংসদ সদস্যেদর বরাদ্দের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সাউন্ড সিস্টেম বিভ্রাট ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম-৭) বিতর্কিত সেই নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনের বদলি করা হয়েছে। গতকাল গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, জনস্বার্থে নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১২, ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। তাকে আজকের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে বলা হয়েছে। অন্যথায় আগামী রোববার থেকে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) বলে গণ্য হবেন। পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি নতুন কর্মস্থলেই দায়িত্ব পালন করবেন।

গত ১২ মার্চ থেকে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম প্রথম অধিবেশনে শব্দযন্ত্রে গোলযোগের শুরু হয়। প্রথম দিনই শব্দযন্ত্রের বিভ্রাটের কারণে অধিবেশন কিছু সময় বন্ধ রাখতে হয়। পরদিনের বৈঠকেও হেডফোন ও সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিরোধী দলীয় জামায়াতের একজন এমপি। তবে এ ঘটনার জাতীয় সংসদের জামায়াত পন্থ’ী নির্বাহী প্রকৌশলীরা ঘটিয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। কারণ তারা জানতো প্রথম অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট বক্তব্য দিবেন তার আগে এটি করা হয়েছে বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ইনকিলাবকে বলেন, আসলে গত ৫ আগস্ট গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালানোর সময় জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। তারা প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ, হুইপদের কার্যালয়সহ ৯ তলা ভবনের প্রায় সব কক্ষ তছনছ করে। এসব মেরামতকাজের জন্য সরকারকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার প্রস্তাব দেয়া হয়। এ পরে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জানুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশন বসবে, এমন বিবেচনায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করে জাতীয় সংসদ সচিবালয়। সেখানে বেশিভাগই কর্মকর্তা এবং প্রকৌশলী জামায়াতপন্থীরা দায়িত্ব পালন করেছেন এখনো করে আসছেন। তারা মনে করেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব থেকে শুরু করে গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রধান প্রকৌশলী এবং সংসদের দায়িত্ব প্রাপ্ত নির্বাহী সকলেই জামায়াতপন্থী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংস্কার সুপারিশের আলোকে সাজানো হয়েছিলো সংসদ অধিবেশন কক্ষ।

জাতীয় সংসদের শব্দযন্ত্রের সমস্যা কি ভাবে করা হয়েছে তারাই বলতে পারবেন বলে মনে করছেন সংসদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এ ঘটনার পরে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই তদন্তের প্রতিবেন আজ গণপূর্ত অধিদপ্তরে হাতে দেয়া হবে বলে জানা গেছে। উদ্বোধনী অধিবেশনেই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদসহ সংসদ সদস্যরা সাউন্ড সিস্টেম ও হেডফোনে মারাত্মক বিভ্রাটের সম্মুখীন হন। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একপর্যায়ে স্পিকার হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে অধিবেশন মুলতবি করতে বাধ্য হন। নতুন সংসদের প্রথম দিনেই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সংসদ সদস্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ নিয়ে গত ২৯ মার্চ দৈনিক ইনকিলাবে ‘আতঙ্কে জামায়াতপন্থী প্রকৌশলীরা” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সাউন্ড সিস্টেমের এই বিপর্যয় কোনো ‘সাবোটাজ’ বা অন্তর্ঘাতমূলক কি না, তা খতিয়ে দেখতে গত ২৮ মার্চ একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে সংসদীয় কমিটি। কমিটিকে আগামী ৩ এপ্রিলের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত চলাকালীন এবং কমিটি গঠনের মাত্র চার দিনের মাথায় দায়িত্বপ্রাপ্ত এই প্রকৌশলীকে বদলি করা হলো। গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শব্দযন্ত্রের স্থায়ী সমাধান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের লজ্জাজনক পরিস্থিতি এড়াতে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *