৬০ টাকার উমেদারের নিয়ন্ত্রণে নাকি ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, আশিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দৈনিক মাত্র ৬০ টাকা মজুরিতে উমেদারের কাজ করেন মো. আশিক উদ্দিন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সামান্য এই পদে থেকেও তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন অফিসের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কার্যক্রম। জমির দলিল নিবন্ধন, নকল উত্তোলন থেকে শুরু করে দাপ্তরিক কাজেও তার প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। এমনকি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাব-রেজিস্ট্রারের ওপরও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, আশিক উদ্দিনের নেতৃত্বে অফিসটিতে একটি দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের মাধ্যমে জমির দলিল নিবন্ধন, নকল সংগ্রহ, জমির শ্রেণি পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কাজে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়। কোনো সেবাগ্রহীতা নির্ধারিত অর্থের বাইরে টাকা দিতে রাজি না হলে তাকে নানা অজুহাতে ঘোরানো হয়। কখনো কাজ আটকে রাখা, আবার কখনো অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি করে হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে। দলিলদাতা, দলিলগ্রহীতা, আইনজীবী ও দলিল লেখকদের কাছ থেকেও বিভিন্ন অজুহাতে টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

শুধু অতিরিক্ত টাকা আদায় নয়, অফিসের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিতে পরিবর্তন আনার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে আশিককে ঘিরে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, রেজিস্ট্রি বহির বালাম বইয়ের বিভিন্ন তথ্য ঘষামাজা করে পরিবর্তন, মূল দলিলের পৃষ্ঠা সরিয়ে ফেলা, নতুন পৃষ্ঠা যুক্ত করা এবং জমির দাগ ও খতিয়ানের তথ্য পরিবর্তনের মতো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই চক্র জড়িত। এ ছাড়া জমির প্রকৃত শ্রেণি পরিবর্তন করে নিবন্ধনের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব কম দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। এসব অনিয়মের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নতুন কোনো সাব-রেজিস্ট্রার যোগদান করলে তাকে নিজেদের প্রভাবের মধ্যে আনার চেষ্টা করে এই চক্র। অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে আশিক নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রারের খাসকামরা থেকে শুরু করে রেকর্ড রুম পর্যন্ত তার অবাধ যাতায়াত রয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। একজন দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মী হয়েও কীভাবে তিনি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজে এমন প্রভাব বিস্তার করছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আশিক উদ্দিনের বিরুদ্ধে এর আগেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠার তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর ২৮১৯, ২৮২০, ২৮২১ ও ২৮২২ নম্বর চারটি দলিল নিবন্ধনে অনিয়মের বিষয়টি তদন্তে উঠে আসে। ওই ঘটনায় সরকারের প্রায় ১৪ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় ব্যাহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। পরে ২০২০ সালের ১৪ ডিসেম্বর ৬৮৪ নম্বর স্মারকের মাধ্যমে তাকে ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে শ্যামপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন মহলে তদবির করে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আবার ধানমন্ডি অফিসে ফিরে আসেন।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল নিবন্ধিত ১৫০৬ নম্বর দলিলের বিপরীতে ২ লাখ ৫৩ হাজার টাকা কর ফাঁকির অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এসব ঘটনার পরও কীভাবে তিনি একই অফিসে প্রভাব ধরে রেখেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

সম্প্রতি আশিক উদ্দিনের বিরুদ্ধে ঘুষ আদায়, দালাল চক্র পরিচালনা, সরকারি নথি জালিয়াতি, গ্রাহক হয়রানি এবং রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ তুলে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে উত্থাপিত বিষয়গুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মো. আশিক উদ্দিন। অন্যদিকে ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নবনিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রার টিনু চাকমার বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, দৈনিক মাত্র ৬০ টাকা মজুরিতে কাজ করা একজন উমেদার কীভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমে এতটা প্রভাব বিস্তার করছেন? তার পেছনে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগগুলো সত্য হলে সরকারি নথি জালিয়াতি, ঘুষ আদায় এবং রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অনিয়মের নেপথ্যের প্রকৃত চিত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *