১০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি, বেনাপোল কাস্টমসে ফাইল আটকে হয়রানির অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বেনাপোল কাস্টম হাউসে আমদানি পণ্য পরীক্ষণের নামে ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং ফাইল আটকে রেখে ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, আমদানি করা পণ্যের ধরন অনুযায়ী ১০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করেন তিনি। দাবিকৃত টাকা না দিলে নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। ফলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও পণ্য পরীক্ষণ ও খালাসের কাজ শেষ করতে ভোগান্তিতে পড়ছেন আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধিরা।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বেনাপোল কাস্টম হাউসের আমদানি পণ্য পরীক্ষণ গ্রুপ-২, ৪ ও ৫-এর দায়িত্বে রয়েছেন রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম। এসব গ্রুপে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নিয়মিত আমদানি হওয়া পণ্য পরীক্ষণের ক্ষেত্রে নতুন নতুন আপত্তি তুলছেন তিনি। এইচএস কোড, পণ্যের ওজন, শ্রেণি, ইনভয়েস মূল্য এবং মানি লন্ডারিংয়ের মতো বিষয় সামনে এনে ফাইল আটকে রাখা হচ্ছে। অথচ সংশ্লিষ্ট পণ্যের কাগজপত্র ও আগের পরীক্ষণ প্রতিবেদন নথিতে থাকার পরও সেগুলো গ্রহণ করতে অনীহা দেখানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

একাধিক আমদানিকারক জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান একই ধরনের পণ্য আমদানি করে আসছে। আগে এসব পণ্য নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষণ শেষে খালাস করা হলেও শফিকুল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন প্রতিটি চালানের পরীক্ষণ করাতে গেলেই নানা প্রশ্ন ও আপত্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। কোনো কাগজে ভুল না থাকলেও সেটিকে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে ফাইলের কাজ শেষ করতে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ তাঁদের।

ব্যবসায়ীদের আরও অভিযোগ, রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম একা নন, তাঁর অধীনে কর্মরত কয়েকজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও একই ধরনের অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরীক্ষণ কার্যক্রমে অযথা জটিলতা তৈরি করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পরীক্ষণ কার্যক্রমে অনিয়মের আরেকটি দিক হলো পণ্য ঘোষণার ক্ষেত্রে বাছাই করা চালানের প্রতি বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, শুল্ককর ফাঁকি দেওয়ার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রেখে নির্দিষ্ট কিছু চালান পরীক্ষণ প্রক্রিয়ায় সুবিধা পাচ্ছে। নরমাল পরীক্ষণের আওতায় থাকা কিছু চালান বিশেষ ব্যবস্থায় পরীক্ষণ প্রতিবেদন তৈরি করে খালাসের সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে বৈধ কাগজপত্রসহ স্বচ্ছ আমদানির চালান পরীক্ষণের সময় ব্যবসায়ীদের অযথা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি শরিফুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, তাঁর আমদানি করা কাপ, পিরিচ ও সিরামিক পণ্যের একটি চালানের পরীক্ষণ প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম ও একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ৭০ হাজার টাকা দাবি করেন। তিনি অগ্রিম ২০ হাজার টাকা দেওয়ার পরও বিভিন্ন অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। পরে আরও এক লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় পণ্য খালাসের কাজ নিয়ে তাঁকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।

সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি শাওন ও মুকুলের অভিযোগ, আমদানি করা মেশিনারিজ পণ্যের পরীক্ষণ প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য তাঁদের কাছে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। পরে বাধ্য হয়ে সমঝোতার মাধ্যমে ফাইলের স্বাক্ষর নিতে হয়েছে বলে জানান তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য, পরীক্ষণ গ্রুপে সরাসরি কাজ করতে গেলে ব্যবসায়ীদের কী ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়, তা সহজেই বোঝা যাবে।

এদিকে প্রায় এক ডজন সিঅ্যান্ডএফ কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, অফিস চলাকালে রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম অনেক সময় মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। অথচ তাঁর টেবিলে ফাইল নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় তাঁদের। তাঁর এমন আচরণ ও ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে পরীক্ষণ গ্রুপের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাঁদের। বিষয়টি তাঁরা সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষ এবং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে জানিয়েছেন বলেও জানান।

পরীক্ষণ কার্যক্রমে এমন হয়রানি অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, অযথা আপত্তি তুলে ফাইল আটকে রাখার কারণে পণ্য খালাসে বিলম্ব হচ্ছে। এতে আমদানিকারকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং রাজস্ব আদায়ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁরা রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামকে পরীক্ষণ গ্রুপের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, তিনটি পরীক্ষণ গ্রুপের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিদিন তাঁকে ৬০ থেকে ৭০টি ফাইল দেখতে হয়। তিনি সিরিয়াল অনুযায়ী প্রতিটি ফাইল যাচাই করে নাম ও স্বাক্ষর দেন। তাঁর দাবি, কিছু সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি নিয়ম ভেঙে আগে ফাইলের কাজ করিয়ে নিতে চান। তাঁদের সেই সুযোগ না দেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে। কাজের চাপ সামলাতে সমস্যা হলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয় বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া কোনো চালানে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনারের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। ফাইলপ্রতি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে পরীক্ষণ গ্রুপে চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানান।

এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার ফাইজুর রহমান বলেন, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক প্রতিটি চালান শতভাগ পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে বন্দরের কাজের পরিমাণের তুলনায় কর্মকর্তা কম থাকায় সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কর্মকর্তা অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *