ইয়েমেনে সরকারি প্রশিক্ষণ শিবিরে হুতিদের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ৫৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শবওয়া প্রদেশে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের এক রক্তক্ষয়ী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৫৩ জন নিহত এবং প্রায় ২০০ জন আহত হয়েছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির গৃহযুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করার প্রেক্ষাপটে সোমবার এই প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় প্রশাসনিক সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং বার্তা সংস্থা রয়টার্স কর্তৃক সত্যতা যাচাইকৃত ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, প্রশিক্ষণ শিবিরের মাঠে চারদিকে রক্তাক্ত মরদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে এবং আহত ব্যক্তিরা বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন।

স্থানীয় প্রশাসনিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা যখন কুচকাওয়াজ ও প্রশিক্ষণ অনুশীলনে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক তখনই হুতি বিদ্রোহীরা পরপর তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

ইয়েমেনের সামরিক কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত শবওয়া প্রদেশটি অ্যাডেন উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত। একই সঙ্গে এটি দেশটির জ্বালানি সম্পদের অন্যতম বড় কেন্দ্র এবং ইয়েমেনের বৃহত্তম শিল্প বিনিয়োগ ‘বালহাফ এলএনজি’ (লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস) প্রকল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

হামলার পরপরই হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় এই হামলার দায় স্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, প্রশিক্ষণ শিবিরটি সৌদি সামরিক বাহিনী পরিচালনা করছিল। তবে হুতিদের এই দাবির ব্যাপারে সৌদি কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সমর্থিত ইয়েমেন সরকার এবং হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গত সেপ্টেম্বরে লোহিত সাগরের কৌশলগত সামুদ্রিক প্রবেশপথ ‘বাব আল-মানদেব’ প্রণালির কাছাকাছি অঞ্চল অভিমুখে হুতিদের অগ্রযাত্রার পর থেকে দুপক্ষের পাল্টা হামলা তীব্র রূপ নেয়। এই হামলার পরিপ্রেক্ষিতে চলতি মাসেই ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী হুতিদের দখলকৃত অঞ্চল পুনরুদ্ধারে ব্যাপক অভিযান শুরু করে। অন্যদিকে, দক্ষিণাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকার অন্যতম প্রধান শহর তাইজ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রেখেছে হুতি বাহিনী।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এসব ঘটনা ইয়েমেন সংঘাতকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যকার বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের আরেকটি নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। বর্তমানে হুতি বিদ্রোহীরা তাদের হামলার পরিধি বাড়িয়ে বিশ্বখ্যাত অপরিশোধিত তেল রফতানিকারক দেশ সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানছে, যার মধ্যে রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘সৌদি আরামকো’ অন্যতম।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে নিলে দেশটির তৎকালীন বৈধ সরকার দক্ষিণে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় এবং পরবর্তীতে ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে। এর ফলে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে কিছুটা শান্ত পরিবেশ সৃষ্টি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা ভেঙে পড়ে আবারও গৃহযুদ্ধ চরম রূপ নিয়েছে। এতে করে ইয়েমেনে তৈরি হওয়া বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট আরও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *